পাঁশকুড়ার হারিয়ে যাওয়া নদী: আজও বেঁচে মানুষের স্মৃতিতে

✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত

আজ বেহুলা নামে কোনও প্রবহমান নদী চোখে পড়ে না। কিন্তু পাঁশকুড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা পুরনো জলপথ, জলাভূমি, পুকুর-বিল, স্থাননাম এবং প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে যেন এখনও বেঁচে আছে সেই নদীর পরিচয়। নদীটির পুরনো গতিপথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সামনে এসেছে এক বিস্মৃত ভূ-ইতিহাস, যা পাঁশকুড়ার অতীতকে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

বেহুলার সন্ধান করতে গিয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কংসাবতী নদীর প্রাচীন নিম্নপ্রবাহের ইতিহাস। বিভিন্ন সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নতুন খাত সৃষ্টি এবং পুরনো জলধারা পরিত্যক্ত হওয়ার ফলে এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আজ যেখানে চাষের জমি, পুকুর, জলাভূমি কিংবা বসতি, সেখান দিয়েই একদিন প্রবাহিত হত বেহুলা নদীর জল।

পাঁশকুড়ার চাঁপাডালি অঞ্চল থেকে রূপনারায়ণের দিকে বিস্তৃত একটি পুরনো জলপথের অস্তিত্ব নানা সূত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতাপপুর, চাঁচিয়াড়া, আটবেড়িয়া, রঘুনাথবাড়ি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে আজও কোথাও কোথাও পুরনো নদীখাতের চিহ্ন চোখে পড়ে। বিস্তীর্ণ নিচু জমি, জলাভূমি, পুকুরের সারি এবং বর্ষাকালে জল জমার স্বাভাবিক প্রবণতা যেন সেই প্রাচীন জলধারার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

স্থানীয় প্রবীণ মানুষের মুখে মুখেও রয়েছে পুরনো জলপথের নানা কথা। কোথাও বলা হয় একসময় সেখানে গভীর খাল ছিল, কোথাও নৌকা চলাচলের স্মৃতি, আবার কোথাও বর্ষার সময় জলধারার প্রবল স্রোতের কথা শোনা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই স্মৃতিগুলি সংরক্ষিত হয়েছে লোককথার মতো। লিখিত ইতিহাসের বাইরে থাকা এই মৌখিক ইতিহাসও তাই নদী অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

বেহুলা নদীর নামের সঙ্গে বাংলার লোকসাহিত্য ও বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনির কথা স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। তবে ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে লোককাহিনি ও বাস্তব ভূগোলকে সতর্কতার সঙ্গে পৃথক করে দেখা প্রয়োজন। মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলার যাত্রাপথে গঙ্গুর নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান পাঁশকুড়া অঞ্চলের এই বিস্মৃত জলধারাকে সরাসরি সেই কাব্যের নদী বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

একটি নদী হারিয়ে গেলেও তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যায় জনপদের উপর। নদীর পুরনো খাত অনেক সময় জলনিকাশি ব্যবস্থার অংশ হয়ে থাকে। সেই পথ ভরাট হয়ে গেলে বা প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে দেখা দেয় জলমগ্নতার সমস্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাঁশকুড়ার বিভিন্ন এলাকায় বর্ষাকালে জল জমে থাকার ঘটনা নতুন করে পুরনো জলপথগুলির গুরুত্ব সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, বিস্মৃত নদীখাতগুলির বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা কি বর্তমান জলনিকাশি সমস্যার সমাধানে কোনও পথ দেখাতে পারে?

২০১৩ এবং ২০২৪ সালের বন্যা পরিস্থিতির সময় পুরনো জলপথের বিভিন্ন অংশে জলপ্রবাহ ও জল জমার ধরনও বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো। প্রকৃতি অনেক সময় নিজের পুরনো পথের কথা মনে করিয়ে দেয়। নদীকে আমরা মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে পারি, কিন্তু তার ভূতাত্ত্বিক স্মৃতি সহজে মুছে যায় না।

আজ প্রয়োজন বেহুলা নদী ও পাঁশকুড়ার অন্যান্য প্রাচীন জলপথ নিয়ে আরও সুসংগঠিত গবেষণা। পুরনো মানচিত্র, ভূমি নথি, উপগ্রহচিত্র, স্থানীয় ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং প্রবীণ মানুষের স্মৃতিকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ একটি হারিয়ে যাওয়া নদীর ইতিহাস অনুসন্ধান শুধুই অতীতের কৌতূহল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে বর্তমানের পরিবেশ, জলনিকাশি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্নও।

বেহুলা আজ আর হয়তো প্রবহমান নদী নয়। তার বুকে আর নৌকা চলে না, তার তীরে আর গড়ে ওঠে না নতুন জনপদ। কিন্তু সে কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? পাঁশকুড়ার মাটির ভাঁজে, পুরনো জলাভূমিতে, স্থাননামের মধ্যে এবং প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে আজও যেন বেঁচে আছে সেই নদী।

হয়তো বেহুলা আজও অপেক্ষা করে আছে, কেউ তার বিস্মৃত পথ ধরে আবার অতীতের দিকে ফিরে তাকাবে বলে।
[আনন্দ বার্তা: খুব শীঘ্রই এবিষয়ে আসছে বৃহৎ প্রকাশনা। খুব তাড়াতাড়িই সেই সংবাদ পাবেন। আপনাদের শুভকামনার প্রত্যাশায় রইলাম।]

✍️রূপেশ কুমার সামন্ত

#Panskura #riverside #flood