ভোটে রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারে সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নবান্নের
বৈশাখী সাহা, কলকাতাঃ
রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার মর্মান্তিক চিত্র আজও শিহরণ জাগায় বঙ্গবাসীর মনে। স্বজন হারিয়ে ব্যাথিত হৃদয়গুলি আজও কেঁদে ওঠে। তাঁদের কথা মাথায় রেখেই রাজ্যে গত ২৫ বছরে ভোটের মুহূর্ত ও ভোট পরবর্তী হিংসায় নিহতদের পরিবারের জন্য এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। ভোট সংঘাতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবার পিছু একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দিতে প্রস্তুতি নিল নবান্ন। আর এই মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক রঙ বা দলীয় পরিচয় দেখা হবে না। নিহত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই সমর্থক বা কর্মী হোন না কেন, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলেই তাঁর পরিবারের যোগ্য সদস্য চাকরির সুযোগ পাবেন- এমনই স্পষ্ট বার্তা দিল শুভেন্দু সরকার।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, স্বজনহারা পরিবার গুলোকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসন দেওয়ার এই প্রস্তাবটিতে ইতিমধ্যেই রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিলেছে। তবে গত ২৫ বছরের পুরনো বিভিন্ন ঘটনার তথ্য খতিয়ে দেখে সঠিক ও উপযুক্ত পরিবার চিহ্নিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। পাশাপাশি এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যাতে ভবিষ্যতে কোনও আইনি জটিলতা বা বিতর্ক তৈরি না হয়, সে কথা মাথায় রেখে আগেভাগে আইন দপ্তরের পরামর্শ ও বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতামত নেওয়া হয়েছে। সমস্ত আইনি দিক খতিয়ে দেখে বিষয়টি কার্যকর করার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি হিসেবে খুব শীঘ্রই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সরকারি সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে জেলা প্রশাসনকে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে এও জানানো হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু যে পরিস্থিতিতে হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ ও তার বিবরণ, প্রমাণস্বরূপ নথিপত্র আবেদন পত্রের সঙ্গে পেশ করতে হবে। জেলা প্রশাসনের তরফে ওই আবেদন জমা পড়বে। জেলাশাসকের দপ্তরেই সেই আবেদনের সমস্ত তথ্য ও নথি যাচাই হবে। পুলিশের রিপোর্ট এবং প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়ার পরেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরী হবে। এরপরই আবেদন করা নিহতদের পরিবারের একজন সদস্যের হাতে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হবে।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল জেলাশাসকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। মূলত জনগণনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আয়োজিত এই বৈঠকের মাঝেই ভোট ও ভোট পরবর্তী হিংসায় নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন মুখ্য সচিব। নিজ নিজ জেলায় বিগত ২৫ বছরে সংঘাতের শিকার হওয়া পরিবার গুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য সমস্ত জেলা শাসককে তৈরি থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এও জানানো হয়েছে যে, বিগত ২৫ বছরে পঞ্চায়েত, পুরসভা বা বিধানসভা- যে কোনো স্তরের নির্বাচনেই রাজনৈতিক হিংসায় প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটে থাকুক না কেন, আর সে তৃণমূল হোক বা বাম আমল, রাজ্যের ভোটে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়েছে যাঁরা, রাজ্য সরকারের এই মানবিক প্রকল্পের আওতায় সেই সমস্ত পরিবারগুলোকে আনা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজ্য সরকারের এই নিরপেক্ষ ও নজিরবিহীন পদক্ষেপের ফলস্বরূপ সরকারের ইতিবাচক দিকটি প্রকাশের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিচার ও আশ্রয়ের আশায় থাকা শতাধিক নিহতদের পরিবারগুলির ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফুটবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্য 0