বিকাশ পাল ঝাড়গ্রাম: খাতার ব্যাগটি কোনোমতে মাথার ওপর শক্ত করে চেপে ধরেছে সাত বছরের শিশুটি। অন্য হাত দিয়ে বাবার আঙুল আঁকড়ে পা ফেলছে লাল মাটির কাদাজলে। হাঁটুজল পেরিয়ে নিমেষেই তা পৌঁছাল এক কোমরে। একটু অসাবধান হলেই জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা। কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, বর্ষা নামলেই এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয় ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর-২ ব্লকের বেলপাহাড়ির রাঙামেটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শবর পরিবারের পড়ুয়াদের।স্বাধীনতার এত দশক পরেও জঙ্গলমহলের এই প্রত্যন্ত জনপদে এখনো পৌঁছায়নি ন্যূনতম পরিকাঠামো। রাঙামেটা গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলা খালের ওপর একটি কালভার্ট বা সেতু না থাকায় বর্ষাকালে কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা এলাকা।গ্রামের এই দুর্দশা দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর বর্ষায় খালের প্রবল স্রোতে ভেঙে ভেসে যায় গ্রামবাসীদের নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করা একমাত্র কাঠের সাঁকোটি। সাঁকো ভাঙার পর থেকেই শুরু হয় চরম দুর্ভোগ। সেই সময়েই হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন গ্রামের বাসিন্দা সুনীল শবর। কিন্তু খালে প্রবল স্রোত এবং এক কোমর জল থাকায় কোনো গাড়ি গ্রামে ঢুকতে পারেনি, এমনকি খাটিয়ায় করে তাঁকে নদী পার করিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। বিনা চিকিৎসায় গ্রামেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তাঁর।ওই ঘটনার পর এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন জেলা শাসক নিজে দুর্গম রাঙামেটা গ্রামে এসে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং দ্রুত স্থায়ী কালভার্ট বা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন। এরপর প্রশাসনের তরফে এলাকায় এসে মাপজোকের কাজও শুরু হয়। কিন্তু দেখতে দেখতে একটি গোটা বছর কেটে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এরই মধ্যে রাজ্যে সরকার বদলেছে। নতুন সরকারের কাছে এখন নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন পিছিয়ে পড়া শবর জনগোষ্ঠীর এই অসহায় মানুষগুলো।গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বর্ষার দিনে খালের জল বাড়লে শিশুরা স্কুলে যাওয়া তো দূরের কথা, বার্ষিক পরীক্ষায় পর্যন্ত বসতে পারে না। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে আজও ভরসা করতে হয় কাঁধে খাটিয়া তুলে বিপজ্জনক জল পারাপারকে। প্রশাসন ও নতুন সরকারের কাছে তাঁদের কাতর আবেদন, এবার যেন আর কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না থাকে; দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে তাঁদের এই নিত্যদিনের নরকযন্ত্রণা ও মৃত্যুর ভয় থেকে স্থায়ী মুক্তি দেওয়া হোক।