‘লক্ষ্মী গ্রাম’-এ মহালক্ষ্মীর আরাধনায় থিমের আসর

শিল্পশহর হলদিয়ার কোলঘেঁষেই এমন একটি জনপদ, যেখানে কোজাগরীর রাতে দুর্গাপুজোর মতোই উৎসবের আমেজ। চিমনির ধোঁয়া আর কারখানার সাইরেনের পাশেই কিসমত শিবরামনগর ও চাউলখোলা গ্রামে ঘরে ঘরে ধুমধাম করে পুজিত হন মহালক্ষ্মী। বড় বাজেটের থিম, পাঁচ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর আত্মীয়-স্বজনের ভিড়ে এই দুই গ্রাম এলাকায় পরিচিত ‘লক্ষ্মী গ্রাম’ নামে। হলদিয়ার কয়েকটি গ্রামে লক্ষ্মীপুজো ‘মহালক্ষ্মী’ নামে খ্যাত। কিসমত শিবরামনগর ও চাউলখোলা মিলিয়ে মোট সাতটি পুজো হয় এখানে। পুজো উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে গ্রামে ফেরেন আত্মীয়-পরিজনেরা, পাঁচ দিন ধরে চলে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ বছর কিসমত শিবরামনগর ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি সংঘের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে থিম ‘ইন্ডিয়া গেট’, থিমের প্রতিমা। কিসমত শিবরামনগর বিনয়ী সংঘের ৭০তম বর্ষে থিম বেনারসের কাশী বিশ্বনাথ মন্দির, ১৮ হাতের নটরাজের আদলে গড়া হয়েছে মহালক্ষ্মীর প্রতিমা। চাউলখোলা অগ্রণী সংঘও ৭০তম বর্ষে থিম করেছে কেদারনাথ মন্দির, সেখানে পূজিত হচ্ছেন সাবেকি লক্ষ্মী প্রতিমা। পুজো কমিটিগুলির নানা সমাজসেবা কাজও করেন।গ্রামের উৎসবের পাশাপাশি শহরেও লক্ষ্মীর ছোঁয়া স্পষ্ট। পুজোর দিন হলদিয়ার মাখনবাবুর বাজার, দুর্গাচক-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিকেল থেকেই বসে অস্থায়ী বাজার। ছোট ছোট লক্ষ্মীপ্রতিমা, ফুল ও পুজোর সরঞ্জাম নিয়ে বসেন বিক্রেতারা, উৎসাহী মানুষের ভিড় জমে কেনাকাটায়। বিক্রি হয় নানা স্বাদের নাড়ুও। মাখনবাবুর বাজারের বিক্রেতা রানী দাস বলেন, “লক্ষ্মীপুজোর আগের এই বিকেলটার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি। দুপুর থেকেই প্রতিমা, ফুল আর নাড়ু সাজিয়ে বসেছি। সন্ধ্যা নামতেই ক্রেতার ভিড় বাড়ে। সবাই চান ঘরের পুজোয় কোনও কিছুর যেন ঘাটতি না থাকে। এই কয়েক ঘণ্টার বিক্রিতেই সংসারে অনেকটা সুরাহা হয়।” লক্ষ্মীপুজোর উপকরণের তালিকায় রয়েছে আলপনার জন্য আতপ চালের গুঁড়ো (পিটুলি গোলা), ঘট, আমপল্লব, ডাব বা সিঁদুর-মাখানো কলা, ধান, দূর্বা, আতপ চাল, পদ্ম, গাঁদা-সহ নানা ফুল, তুলসীপাতা, বেলপাতা, ধূপ, প্রদীপ, ঘি, কর্পূর, পঞ্চপ্রদীপ, সিঁদুর, চন্দন, আলতা, শাঁখা, লাল সুতো, নৈবেদ্যর জন্য ফল (কলা, আপেল, নারকেল, শসা প্রভৃতি) ও মিষ্টি, নাড়ু, মুড়কি, খই, পায়েস ও খিচুড়ি ভোগ, লক্ষ্মীর পটে বা প্রতিমায় পরানোর জন্য নতুন বস্ত্র এবং লক্ষ্মীর ঝাঁপি, কড়ি, ধানের শিষ ও লক্ষ্মীর পাঁচালি। শিল্পনগরীর ব্যস্ততার মাঝেও ঐতিহ্য আর আধুনিক থিমের মেলবন্ধনে ‘লক্ষ্মী গ্রাম’-এর এই উৎসব প্রতি বছরই নতুন করে টেনে আনছে হাজারো মানুষকে।