মাছ বিক্রি, সবজি চাষ, মেদিনীপুর স্টেশনে রাত কাটানো! সেই সুধন মাঝিই আজ বেঙ্গালুরুর IISc-র অধ্যাপক, নেপথ্যে কোন লড়াই?

নিজস্ব সংবাদদাতা, দাঁতন: কখনও মাছের ব্যবসা, কখনও মাঠে সবজি চাষ, আবার কখনও সাইকেলে সবজি চাপিয়ে দাঁতনের বাজারে বিক্রি। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে একসময় অর্থের অভাবে রাত কাটাতে হয়েছিল মেদিনীপুর স্টেশনে। জীবনের এমনই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে আজ বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের অধ্যাপক দাঁতনের প্রত্যন্ত গ্রাম বেলমুলার সন্তান সুধন মাঝি। কিন্তু তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে আরও এক কাহিনি—পরিবারের ত্যাগ, বন্ধুদের সহযোগিতা আর হার না মানা এক লড়াই।

ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন সুধন মাঝি। পড়াশোনার পাশাপাশি সামলাতে হয়েছে বাড়ির চাষবাস, গরুর দেখাশোনা থেকে শুরু করে নানা কাজ। বাড়িতে উৎপাদিত সবজি সাইকেলে চাপিয়ে দাঁতনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। বেলদার কালিয়াপাড়া স্কুলে পড়ার সময় থেকেই শুরু হয়েছিল এই সংগ্রাম। পরে বেলদা গঙ্গাধর অ্যাকাডেমিতে পড়াশোনা করেন। সংসারের অভাব থাকলেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহে কখনও ভাটা পড়েনি।

তাঁর জীবনের কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন মা, বাবা ও দাদা। নিজেদের অভাব-অনটনের মধ্যেও তাঁরা সুধনবাবুর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি, সহপাঠী বন্ধুদের অবদানও আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। শিক্ষকদের সাহায্যও তাঁর এগিয়ে চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

কিন্তু পড়াশোনায় ভালো ফল করেও একসময় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাড় করা পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে অর্থের অভাবে মেদিনীপুর স্টেশনে রাত কাটাতে হয় তাঁকে। সেই সময় এক বন্ধুর মাধ্যমে ভোটের কাজে হোমগার্ড হিসেবে কাজের সুযোগের কথা জানতে পারেন। কাজের খোঁজে ঝাড়গ্রামে গিয়ে ডিউটি করেন। সেই কাজ থেকে পেয়েছিলেন মাত্র ১,৩৩৯ টাকা। জীবনের সেই কঠিন সময়েও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি তিনি।

এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা। মেদিনীপুর কলেজে পড়াশোনার পর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে আইআইটি খড়গপুরে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ পান। তাঁর শিক্ষাজীবন পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক স্তরেও। সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান এবং ফ্রান্সের INSA-তে গবেষণা-পরবর্তী কাজ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আইআইটি পাটনায় অধ্যাপনার দায়িত্ব সামলানোর পর বর্তমানে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত সুধন মাঝি।

তবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও নিজের গ্রামের কথা ভোলেননি তিনি। বিদেশে থাকাকালীন দাঁতনের একাধিক স্কুলের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এবার তাঁর স্বপ্ন, দাঁতনে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গড়ে তোলা। পাশাপাশি, এলাকার ছাত্রছাত্রীরা যাতে নিজেদের কাছাকাছি থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পায়, তার জন্য একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গড়ে তোলার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

সুধন মাঝির কথায়, “বড় বড় স্বপ্ন দেখি, কিন্তু কতটা সফল করতে পারব জানি না।”

যে মানুষটিকে একসময় উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল, আজ তিনিই নিজের এলাকার পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলবে।

বেলমুলার মাটি থেকে বেঙ্গালুরুর IISc—সুধন মাঝির এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, বন্ধুদের সহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস। এবার নিজের সাফল্যের পাশাপাশি দাঁতনের শিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন তিনি, সেদিকেই তাকিয়ে এলাকাবাসী।