প্রয়াত যোগেন চৌধুরী, স্মৃতিচারণায় দেউলিয়া বালিকা বিদ্যালয়

নিজস্ব সংবাদদাতা, কোলাঘাট

প্রখ্যাত শিল্পী ও প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন রবিবার, ২৫ অক্টোবর। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট ব্লকের পানশিলার দেউলিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে। কারণ এই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন তৈরিতে আর্থিক সাহায্য করে এই গ্রামীণ স্কুলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা তাপসী দাস ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেন। তাঁর কথায়, ২০১৫ সালে একটি সূত্রের মাধ্যমে যোগেনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তখন তিনি রাজ্যসভার সাংসদ। স্কুলের পরিকাঠামো গড়তে উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগের বিভিন্ন বিষয়ের ল্যাবরেটরি, সরঞ্জাম, চেয়ার-টেবিল ও লাইব্রেরির জন্য চিঠি লিখে আবেদন করেন তিনি। যোগেনবাবু স্কুল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পাঠান, তার পরে ওই বছরই ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন। সেই টাকায় তৈরি হয় একটি দ্বিতল ভবন, যেখানে রয়েছে একাধিক ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরি। ভবনের নাম রাখা হয় বিজ্ঞান ভবন। কাজ চলাকালীন যোগেনবাবুর আপ্তসহায়ক সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। কাজ শেষের পরে তাপসীদেবী, তৎকালীন স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতি সঞ্জয়কুমার মাইতি-সহ একটি প্রতিনিধি দল কলকাতার নিউ টাউনে শিল্পীর বাড়িতে গিয়ে দেখা করে। আগেই জানানো হয়েছিল, সময় মিলবে মাত্র ১০ মিনিট। কিন্তু সেই আলাপ গড়ায় পঞ্চাশ মিনিটেরও বেশি।তাপসীদেবী বলেন, “গ্রামের স্কুল সম্পর্কে এত আগ্রহ নিয়ে তিনি খোঁজ নিচ্ছিলেন যে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।” যোগেনবাবুর মত ছিল, বিভিন্ন স্কুলকে অল্প অল্প টাকা দিয়ে কাজ অসম্পূর্ণ রাখার চেয়ে একটি স্কুলের কাজ সম্পূর্ণ করে দেওয়াই ভাল। স্কুলের ভবন-সহ নানা ছবি দেখে তিনি সন্তুষ্ট হন এবং স্কুলে আসার আগ্রহও প্রকাশ করেন। ৫০ লক্ষ টাকাতেই থেমে থাকেননি তিনি, স্কুলের। একটি অসম্পূর্ণ কমিউনিটি সেন্টার তৈরির জন্য আরও ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন।২০১৯ সালে সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়।পরে আরও এক বার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান স্কুলের প্রতিনিধিরা। দু’বারই কোলাঘাটের গোলাপ, রজনীগন্ধা এবং স্কুলের বাগানের শাকসবজি উপহার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা, যা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন যোগেনবাবু। ২০২০ সালে স্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপনের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে অতিথি হিসেবে পেতে চেয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। সেই উদ্দেশ্যে যোগেনবাবু প্রণববাবুকে একটি সুপারিশপত্রও পাঠান। সেই চিঠি আজও স্কুলের সংগ্রহে রয়েছে। ২০২৫ সালে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগেনবাবুর নিজের আসার কথা ছিল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। সুমন্তবাবু জানান, প্রায় একশোটিরও বেশি স্কুলকে সাহায্য করেছেন শিল্পী, দুই মেদিনীপুর জেলাতেও একাধিক স্কুল তাঁর আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে। কাজ সম্পূর্ণ করে দিতে চাইতেন বলে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করতেন তিনি। তাপসীদেবী বলেন, “অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন তিনি। তাঁর বাড়ির বসার ঘরে গিয়ে দেখেছি, প্রচুর ছবি আর ভাস্কর্য। অথচ যে চাদরটি গায়ে দিতেন, তাতে ফুটো দেখেছি। এই সরল, নিরহঙ্কার জীবন আমাদের মুগ্ধ করেছিল। আক্ষেপ একটাই, তিনি আর আমাদের স্কুলে আসতে পারলেন না।” যোগেনবাবুর প্রয়াণে শোকাহত স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। স্কুলে এখন পুজোর ছুটি চলছে। ছুটি মিটলেই শোকসভার আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষিকা।