দুর্গাপুজোর আগে যখন মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলে, তখন হাওড়ার কয়েকটি গ্রামের কারিগরেরা ব্যস্ত থাকেন এক বিশেষ কাজে। তাঁদের হাতে তৈরি হয় দুর্গাপ্রতিমার চুল! হাওড়ার পার্বতীপুরে মুসলিম কারিগরেরা পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি করেন দেবদেবীর কেশসজ্জার উপকরণ। অন্যদিকে, পাঁচলার কুলাই গ্রামে কৃত্রিম সুতো দিয়ে তৈরি হয় পরচুলা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলাতেও রয়েছে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগর। কাঁচামাল সংগ্রহ, আঁশে রং করা, শুকিয়ে নেওয়া, চুলের গোছা তৈরি এবং পরচুলা সাজানো—প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হয় অভিজ্ঞতা ও নিপুণ হাতের কাজ।

এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বহু পরিবারের মানুষ। তাঁদের তৈরি সামগ্রী পৌঁছে যায় বিভিন্ন প্রতিমাশিল্পীর কাছে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও কাজের সূত্রে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক নির্ভরতা। বাংলার দুর্গাপুজোর জাঁকজমকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই শিল্প, কারিগরদের জীবন এবং তাঁদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের গল্প জানলে দুর্গাপুজোকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও আরও সমৃদ্ধ হবে।

----

কলকাতার কুমোরটুলিতে যখন দুর্গাপ্রতিমার শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা চলে, তখন সেই প্রস্তুতির অনেকটা জুড়ে থাকে হাওড়ার একটি গ্রামের কারিগরদের পরিশ্রম। গ্রামের নাম পার্বতীপুর। এখানকার মুসলিম পরিবারগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাটের আঁশ দিয়ে দুর্গা, কালী-সহ বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমার চুল তৈরি করে আসছে। শুধু পার্বতীপুর নয়, হাওড়ার পাঁচলার কুলাই গ্রামেও মুসলিম কারিগরদের হাতে তৈরি হয় দেবদেবীর পরচুলা। তাঁদের তৈরি সামগ্রী পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যেও পৌঁছে যায়। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের শ্রমেই সম্পূর্ণ হয় প্রতিমার কেশসজ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

পার্বতীপুরের এই শিল্পের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরনো। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় দেশভাগের পরে পাটের জোগান ও বাজারের পরিবর্তনের ফলে প্রতিমার সাজসজ্জার উপকরণের চাহিদা মেটাতে নতুন উদ্যোগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে স্থানীয় কারিগরেরা পাটের আঁশ থেকে প্রতিমার চুল তৈরির কাজকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যান। এই কাজে ইখলাখ চাচার মতো স্থানীয় উদ্যোগীদের অবদানের কথাও উঠে এসেছে। ধীরে ধীরে গ্রামের একাধিক পরিবার এই শিল্পে যুক্ত হয়। প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি মুসলিম পরিবারের পাশাপাশি কয়েকটি হিন্দু পরিবারও এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে পার্বতীপুর প্রতিমার কৃত্রিম চুল তৈরির অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এই চুল তৈরির কাজ শুরু হয় কাঁচামাল সংগ্রহের মাধ্যমে। সাধারণত পাটের আঁশ সংগ্রহ করে সেগুলিকে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা করা হয়। এরপর আঁশ রং করার পালা। দুর্গাপ্রতিমার জন্য কালো চুলের চাহিদা বেশি হলেও শিবের মতো অন্য দেবতার প্রতিমার সাজে লাল, কমলা বা রুপোলি রঙের চুলও তৈরি হয়। রং করার জন্য বড়বাজার থেকে আনা রং ব্যবহার করা হয় বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পাটের আঁশ রং করার পরে তা তাপের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং পরে খোলা জায়গায় শুকোতে দেওয়া হয়। আবহাওয়া এই পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোদ না থাকলে আঁশ শুকোতে দেরি হয়, আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামলে শুকনো আঁশ ভিজে গিয়ে পুরো কাজের সময়সূচি বদলে যেতে পারে।

আঁশ শুকিয়ে গেলে শুরু হয় পরবর্তী পর্যায়। প্রথমে সেগুলি জটমুক্ত করে আঁচড়ানো হয়। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে বিভিন্ন মাপের গোছা তৈরি করা হয়। প্রতিমার চুল কতটা লম্বা, ঘন বা কোঁকড়ানো হবে, তা নির্ভর করে নকশা ও প্রতিমার ধরনের উপর। কুমোরটুলির শিল্পীদের কাছে এই চুলের বিভিন্ন পরিচিত নামও রয়েছে। লম্বা কোঁকড়ানো চুলকে ‘লাইলন’ বলা হয়, আর নির্দিষ্ট ধরনের সূক্ষ্ম কেশসজ্জার উপকরণ পরিচিত ‘ক্রেপ’ নামে। সিংহের কেশর তৈরির জন্য আলাদা উপকরণও ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রতিমার মাথার চুল থেকে বাহনের কেশর—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা দক্ষতা ও কাঁচামাল লাগে।

পার্বতীপুরের কাজের বিশেষত্ব হল, চুল তৈরির প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবারের মানুষ যুক্ত থাকেন। মুসলিম পরিবারের পুরুষেরা সাধারণত কাঁচামাল সংগ্রহ, রং করা, প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহের দায়িত্ব সামলান। অন্যদিকে বহু হিন্দু মহিলা আঁশ গুছিয়ে চুলের গোছা তৈরি, গোটানো ও বাঁধার কাজে যুক্ত। তবে এই কাজের ভাগ সব পরিবারে এক রকম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাড়ির মহিলারা সংসারের কাজ সামলে অবসর সময়ে চুল বাঁধেন। ফলে এই শিল্প গ্রামীণ পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের একটি উৎসও হয়ে উঠেছে। কোনও একক কারিগরের পক্ষে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা কঠিন; একাধিক মানুষের সম্মিলিত শ্রমেই তৈরি হয় ব্যবহারযোগ্য কেশসজ্জার উপকরণ।

হাওড়ার পাঁচলার কুলাই গ্রামের শিল্পীদের কাজের ধরন কিছুটা আলাদা। সেখানে নাইলন বা সিন্থেটিক সুতো দিয়ে দেবদেবীর পরচুলা তৈরি করা হয়। প্রথমে সুতো ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তারপর সেগুলি সমান করে গুছিয়ে বিনুনি পাকানো হয়। এই বিনুনি তৈরির কাজেই হাতের সূক্ষ্ম দক্ষতা প্রয়োজন। চুলের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব এবং প্রতিমার নকশা অনুযায়ী পরচুলার আকার বদলে যায়। কুলাইয়ের বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় যুক্ত। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামের প্রায় ২৫০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছে। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি জন্মাষ্টমী, কালীপুজো এবং রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের সাজসজ্জার জন্যও তাঁদের কাছে বরাত আসে। তাঁদের তৈরি পরচুলা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি এবং মুম্বইয়ের মতো জায়গাতেও পৌঁছয়।

এই শিল্পের সঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলারও যোগ রয়েছে। সেখানে আজিবর শেখ ও নুর হোসেনের মতো কারিগরেরা সরু সুতো দিয়ে বিশেষ ধরনের কেশসজ্জার উপকরণ তৈরি করেন। পার্বতীপুরের কারিগরদেরও নির্দিষ্ট প্রয়োজন মেটাতে আমতলার তৈরি উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। অর্থাৎ, প্রতিমার চুল তৈরির কাজ কোনও একটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন এলাকার কারিগরেরা একে অপরের তৈরি সামগ্রীর উপর নির্ভর করে একটি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

তবে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। হাতে তৈরি চুলের তুলনায় যন্ত্রে তৈরি সামগ্রী অনেক সময় কম দামে বাজারে পাওয়া যায়। ফলে ছোট কারখানা ও পারিবারিক উৎপাদনের উপর চাপ বাড়ছে। পাটের দাম বৃদ্ধি, কাঁচামালের জোগান, বর্ষার অনিশ্চয়তা এবং মরশুমি চাহিদাও ব্যবসার উপর প্রভাব ফেলে। দুর্গাপুজোর আগে কাজের চাপ বাড়লেও বছরের অন্য সময়ে আয় তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পার্বতীপুর ও কুলাইয়ের কারিগরেরা তাঁদের পারিবারিক পেশাকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে কাজ শেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

#DurgaPuja #MuslimArtisans #BengalHeritage #Kumartuli #IndianCulture #DeltasItikotha