কলকাতার হাসপাতালে প্রাণরক্ষা ত্রিপুরার নবজাতকের

বৈশাখী সাহা, কলকাতাঃ

কথায় বলে, "রাখে হরি, তো মারে কে!" কথাটা একেবারে সত্যি প্রমাণিত হল। বিরল অস্ত্রোপচার করে জন্মগত কারণে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা এক নবজাতকের অন্ত্রের চিকিৎসা করে সদ্যজাত-র প্রাণ রক্ষা করে নজির গড়ল চিকিৎসকেরা। কলকাতার মুকুন্দপুরের মনিপাল হাসপাতাল থেকে এমনই ঘটনা ধরা পড়ে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ত্রিপুরার আগরতলায় শিশুটি জন্মগ্রহণ করতেই চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন যে, তাঁর চিকিৎসার জন্য অন্যতম পরিকাঠামো সমৃদ্ধ নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট এবং পেডিয়াট্রিক সার্জারি টিমের জরুরী সাহায্য প্রয়োজন। পেটের ভিতরে অন্ত্র ধরে রাখার জন্য যে প্রাচীর থাকে তা ঠিকমত তৈরি না হওয়ায় তা বাইরে উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল। চিকিৎসা পরিভাষায় এই জটিল ও বিরল জন্মগত ত্রুটিকে বলা হয় 'ওম্ফালোসিল'। দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে কলকাতায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জন্মের ৪ দিন পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে শিশুটিকে কলকাতার ওই হাসপাতালে এনে এনআইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, চিকিৎসকদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নবজাতককে স্থিতিশীল করা এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা অন্ত্রের অংশগুলির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা। দীর্ঘ সময় ধরে অন্ত্র বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে থাকলে সেখানে জল জমে ফুলে যায়। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় 'ইডিমা' বলা হয়। অন্ত্র মারাত্মকভাবে ফুলে গেলে সেটিকে আবার নিরাপদে পেটের ভেতর ফিরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ওই ধরনের জটিলতায় সাধারণত দুই দফায় বা ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচার করতে হয়। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেন, চারদিন পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শিশুটির বাইরে বেরিয়ে থাকা অন্ত্রের টিস্যু বা অংশগুলি যথেষ্ট তাজা, সুস্থ ও নমনীয় অবস্থায় ছিল। ফলে চিকিৎসকরা ঝুঁকি নিয়ে একটি মাত্র অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। শিশুটি হাসপাতালে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসক সুভাশিষ সাহা (ক্লিনিক্যাল লিড- পেডিয়াট্রিক সার্জারি ও পেডিয়াট্রিক ইউরোলজি) এবং অতনু কুমার জানার ( নিওনেটাল ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান, পেডিয়াট্রিশিয়ান ও নিওনেটোলজিস্ট) তত্ত্বাবধানে শিশুটির চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। পুরো অন্ত্রটিকে পেটের ভিতরে সঠিকভাবে স্থাপনের পর পেটের দেওয়াল সেলাই করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। ফলস্বরূপ শিশুটিকে দ্বিতীয়বার কঠিন অস্ত্রোপচারের ধকল সহ্য করতে হয়নি। ওই চিকিৎসা সম্পর্কে ডঃ শুভাশিস সাহা বলেন, 'ওম্ফালোসিলের চিকিৎসায় পেটের ত্রুটির মাত্রা, বাইরে থাকা অন্ত্রের অবস্থা ও নবজাতকের সার্বিক স্বাস্থ্য বিচার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শগতভাবে, এই শিশুদের দ্রুত বিশেষায়িত কেন্দ্রে আনা দরকার। এই শিশুটি চতুর্থ দিনে এলেও তাঁর অন্ত্র ভালো অবস্থায় থাকায় আমরা একবারে একক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা শেষ করতে পেরেছি। অস্ত্রোপচারের পর শিশুটি খুব সুন্দরভাবে সুস্থ হয়ে উঠছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জন।' অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সংকট ও পরিচর্যা সম্পর্কে ডঃ অতনু কুমার জানান, 'ওম্ফালোসিল' আক্রান্ত শিশুদের পেটের ভেতরটা বেশ ছোট ও অপরিণত থাকে। ফলে অন্ত্র ভেতরে স্থানান্তরের পর পেটের ভেতরের চাপ বাড়ে, যা ফুসফুসে চাপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অস্ত্রোপচারের পর ফুসফুসের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখা, সংক্রমণ আটকানো এবং সঠিক পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছিল প্রধান লক্ষ্য। সৌভাগ্যবশত, শিশুটির জন্মগত অন্য কোনোরূপ জটিলতা না থাকায় দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে সে।' নবজাতক বিপদমুক্ত হয়ে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় অত্যন্ত খুশি তাঁর পরিবার পরিজনেরা। ডাক্তার ছুটি ঘোষণা করলেই নবজাতককে কোলে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন বলে জানান তাঁরা।