আগে রেলওয়ে স্টেশান অথবা এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে বেরলেই দেখা যেত Yatri Sathi কাউন্টারে (তার পূর্বে কলকাতা পুলিশ, হাওড়া পুলিশ, বিধাননগর পুলিশের প্রি-পেইড ট্যাক্সি) লম্বা লাইন। কারন একটাই, যাতে শহরে আসা নতুন মানুষজন কোনভাবে প্রতারিত না হন। খুব তাড়া না থাকলে আমরা কলকাতা শহরকে চেনা মানুষরাও প্রি-পেইড লাইনে দাঁড়াতাম কারন দেখা যেত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিটার বা অন্য অ্যাপের তুলনায় সেটা সস্তা পড়তো। এই প্রথমবার দুইদিন আগে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে সম্পূর্ণ অচেনা অভিজ্ঞতা হল, সেইটাই বলবো।

মঙ্গলবার আমার কোন তাড়া ছিল না তাই বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময়তেই ঠিক করেছিলাম যে Yatri Sathi কাউন্টার থেকে ক্যাব নেব। যেই গেট দিয়ে বেরলাম তার সামনেই দেখি একটা ফাঁকা Yatri Sathi কাউন্টার। কিছুটা অবাক আর কিছুটা আনন্দিত হয়ে এগিয়ে গেলাম। অ্যাপ খুলে জায়গা সিলেক্ট করে কাউন্টারে গিয়ে সেখানকার ভদ্রলোককে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম বুক করবো কিনা। উনি বললেন এইখানে হবেনা আপনি চার নাম্বার গেটের সামনের কাউন্টারে যান। একটু অদ্ভুত লাগতেও ভাবলাম হয়তো এখানে কোন সাময়িক গণ্ডগোল হওয়াতে উনি বলছেন। জিনিসপত্র নিয়ে বেশ অনেকটা হেঁটে গেলাম চার নাম্বার গেটের সামনে। সেইখানেও মোটামুটি ফাঁকা। কাউন্টারে বসেছিল একটি অল্পবয়স্ক ছেলে যাকে দেখলে বাঙালি বলেই মনে হয় কিন্তু আমার সব কথার উত্তর সে হিন্দিতে দিল। তার পিছনে কাউন্টারের ভেতরেই জনাদুয়েক পুলিশ বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে আমার বাড়ি প্রি-পেইডে প্রতিবার ওঠে ১৯৫ টাকা। এবারেও Yatri Sathi অ্যাপে তাই দেখাচ্ছিল, ছেলেটিকে বললাম বুক করি? ছেলেটি হিন্দিতে বলল এসি বুক করুন, এমনি ক্যাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাড়া নেই এদিকে লাইনও নেই তাই নন এসিই ক্লিক করলাম। আমার দেখাদেখি আরও দুজন ক্লিক করলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম লাইনটা কোথায়? কে কার আগে কে পরে দাঁড়াবে? ছেলেটি হিন্দিতে উত্তর দিল এইতো দাঁড়িয়ে পরুন আপনি তারপর আপনি তারপর আপনি (কোনও ইচ্ছা অথবা নিয়ম অবশিষ্ট নেই বুঝতে পারলাম)। পিছনে দুইজন পুলিশ তখনও ঝালমুড়ি খেয়ে চলেছেন। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম এইভাবে হয় নাকি, কোন সিস্টেম নেই? আগে তো এরকম ছিল না। ছেলেটি হিন্দিতে জানালো এসি গাড়ি বুক না করলে পাওয়ার চান্স খুব কম। বুঝলাম এখন অলিখিত নিয়ম এইটাই, মুখ ফুটে বলতে পারছে না তাই লাইনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে নিতে দিচ্ছিল। বললাম বেশ তাহলে এসি বুক করছি এখানেই আসবে তো? বলল হ্যাঁ। করলাম বুক ৩০৫ টাকার এসি ক্যাব। নিল একটা বুকিং, দেখালাম তাকে, বলল নিজেকেই কথা বলে নিতে হবে। কল করলাম, ড্রাইভার বলে আমি departure-এ আছি আপনাকে এখানে আসতে হবে? ড্রাইভার পাগল কিনা সেটা তাঁকে জিজ্ঞেস করার পর বললাম আমি জিনিসপত্র নিয়ে এখন ওপরে যাবো, আপনি আসতে পারবেন না? বুকিং ক্যানসেল করে দিল ড্রাইভার, আবার নতুন ড্রাইভার খুঁজতে লাগলো অ্যাপ, কাউন্টারের চেয়ার গরম করতে লাগলো হিন্দিভাষী বাঙালি ছোকরা এবং ঝালমুড়ির ঠোঙা ফাঁকা করতে থাকলো পুলিশ।

বুক হল আবার একটা এসি ক্যাব। ছোকরা বুঝিয়ে দিল আমাকেই ফোন করে কথা বলতে হবে, ও চেয়ারে বসে আছে সেটাই বা কম কী? করলাম ফোন, ড্রাইভার বলল ৩৫০ টাকা দিতে হবে তাহলে আসছি ২ মিনিটে। সেটাও মেনে নিলাম। ড্রাইভার এল, ক্যাবে উঠলাম, ওটিপি দিলাম। ড্রাইভার বলল দাদা আমার ফোনে চার্জ কম আছে ফোনটা বন্ধ করে দিলে অসুবিধা নেই তো। আমি ভাবলাম জিপিএস ম্যাপের কারনে জিজ্ঞেস করছে। রাস্তা তো আমার চেনা, ম্যাপ না থাকলেও অসুবিধা নেই। বললাম ঠিক আছে। ড্রাইভারদাদা ওমনি ট্রিপটা ক্যানসেল করে ফোনটা অফ করে দিলেন। এই সবই ঘটছে Yatri Sathi কাউন্টারের সামনে, আগে যেখানে ক্যাব চালকরা দাঁড়িয়ে আপনি-আজ্ঞে করতো। আমি বললাম দাদা এটা কী হল? আপনি তো ফোন অফ করার কথা বলেছিলেন, ট্রিপ ক্যানসেল করলেন কেন? তাতে ড্রাইভারদাদা বললেন, আপনার যেখানে যাওয়ার সেখানে পৌঁছে দেবো তো (উদ্ধার করবো)। উত্তরে আমি বললাম, দাদা আমিও তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি ট্যাক্সি বলে চিৎকার করে ক্যাব ডাকতেই পারি, অ্যাপ দিয়ে ডাকলাম কেন তাহলে? বলে দরজা খুলে নেমে পড়লাম। কাউন্টারে ঝুঁকে বেশ ঝাঁজের সাথে বললাম, এইরকম কিন্তু ছিল না প্রি-পেইড সার্ভিস, আপনারা ইচ্ছে করে নষ্ট করছেন এই সরকারি সুযোগটুকুও বন্ধ করার জন্য। ড্রাইভার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রিপ ক্যানসেল করছে মিথ্যে বলে। হিন্দিভাষী বাঙালি এবং পিছনের দুই পুলিশ একবার মুখ তুলে তাকালো, পরক্ষনেই আবার ঝালমুড়িতে মন দিল। ক্যাবের ভেতর থেকে ক্যাবচালক তখন বলছিল যে সে এরকম কিছুই করেনি। আমি জিনিসপত্র নিয়ে পা বাড়ালাম র‍্যাপিডো ক্যাবের কাউন্টারের দিকে। ৩৬৩ টাকা দিয়ে ক্যাব বুক করে বাড়ি এলাম। বুঝতে পারলাম, Yatri Sathi আর বেশিদিন নেই।